Alor Sandhane - আলোর সন্ধানে
ষষ্ঠ পর্বঃ
শ্রীশ্রীহরি-গুরুচাঁদ ঠাকুর ও আলোর পথ :
ঊন-বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে বাংলা তথা সমগ্র ভারতবর্ষে এক ঘোর তমসাময় পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিল একশ্রেণীর মানুষের দ্বারা । এরা কোন বিশেষ সম্প্রদায়ভুক্ত নয় । যারা অলীক ধর্মের নামে, শাস্ত্র-গ্রন্থের নাম করে মূলনিবাসী-দের সমস্ত অধিকার থেকে বঞ্চিত করে দাসত্বের শৃঙখলে আবদ্ধ করেছিল কয়েক শত বৎসর । নিজেদের স্বার্থ কায়েম করবার জন্য, ছলে-বলে-কৌশলে সমাজকে ঠেলে দিয়েছিল এক অন্ধকারাচ্ছন্ন নরকে; এমনকি রাজশক্তিকেও এরা করেছিল কব্জাগত । হিন্দু রাজার সময় এরা সেজেছে বড় পুরোহিত আবার মুসলীম রাজার সময় এরাই গো-মাংস ভক্ষণকারী ! এককথায় এরাই হল ‘ব্রাহ্মণ্যবাদী’। কোন বিশেষ সম্প্রদায় নয় । সমাজের সেই ঘোর তমসাময় অবস্থায় মানুষ রাস্তা দিয়ে স্বাধীনভাবে চলাফেরার অধিকারও হারিয়েছিল; ছিল না কোন মর্যাদা । ধর্মের নামে এত অত্যাচার, শাষন ও শোষনে মানুষ ভুলতে বসেছিল তাঁর আত্মধর্ম । নিজেকে হীন ভাবতে শুরু করেছিল এবং শুরু হয়েছিল ধর্মান্তরিত হবার প্রবণতা ও যুগ সংকট ।
এই যুগ সংকট থেকে মুক্ত হবার উদাত্ত আহ্বান নিয়ে ১৮১২ খ্রীষ্টাব্দের ১১ই মার্চ বুধবার পূর্ববঙ্গের ফরিদপুর জেলার সফলাডাঙ্গা গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন যুগাবতার মহামানব শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুর । পরবর্তি সময়ে জমিদারের অত্যাচারের কারণে সফলাডাঙ্গা ত্যাগ করে ওড়াকান্দী গ্রামে গিয়ে বসতি স্থপন করেন । শুরু হয় এক নূতন দিগন্ত ।
যুগাবতার হরিচাঁদ ঠাকুর সমস্ত ভন্ডামী ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন বালক বয়স হতেই । তিনি লক্ষ করেছিলেন কিভাবে মানুষ ধর্মের কারণে ব্যভিচারে লিপ্ত হচ্ছে । আত্মমর্যাদাবোধ হারিয়ে কিভাবে অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে । এসব লক্ষ করেই তিনি এর প্রতিবিধানের জন্য নিরলস সংগ্রাম করেছেন আজীবন । ঠাকুর এসেছিলেন সুবিচারের ন্যায়দন্ড হাতে নিয়ে । সাকার, নিরাকার, বৈষ্ণবধর্ম, শাক্তধর্ম, ইসলামধর্ম, খ্রীষ্টানধর্ম যেখানে যত ধর্ম আছে, সর্বধর্মের নির্যাসে শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুর তাঁর জীবনচর্চায় শাশ্বত যে মূলবস্তুটি বিশ্বমানবকে উপহার দিলেন তা হল “মানবধর্ম” । পূর্বের যে সব মহাপুরুষ বা মহামানবের পদচিহ্ন আমরা এই ভারতবর্ষের ধূলায় খুঁজে পেয়েছি তাঁরা কেউ পিছিয়ে পড়া পতিত মানুষের হাত ধরে টেনে তোলেননি । মনুষ্যত্ত্বের অধিকার প্রদান বা রাজনৈতিক চেতনা প্রদান করেননি । তাঁরা সংসার বা নারীকে নির্মম ও নির্দয়ভাবে উপেক্ষা করেছেন । তাঁদের মতে-----নারী সাধন পথের অন্তরায়, নারী নরকের দ্বার, নারীর প্রয়োজন শুধুমাত্র “পুত্রার্থে ক্রীয়তে ভার্য্যা” । ‘নারীর হাত ধরে পাপ প্রবেশ করে’ এই অজুহাতে তাঁদের সমস্ত রকম অধিকার হতে বঞ্চিত করা হত। এমন এক সময় ছিল বিধবা নারীর সূর্যের মুখ দেখা নিষিদ্ধ। লেখাপড়ার তো কোন প্রশ্নই ওঠে না । হাজার রকমের নিয়মের বেড়াজালে বেঁধে একটা বিধবা মেয়েকে তিলে তিলে শেষ করে দেওয়া হত । অথচ বহুবিবাহ করতে বর্ণবাদীদের কোন বাঁধা ছিল না ! যে নারী মানব জাতির সৃষ্টির কারণ, সেই নারীর উপর কত’ই না নির্যাতন ও লাঞ্ছনা !! তাই যুগাবতার শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুর বললেন------নারীজাতি মাতৃজাতি, তাকে সম্মান দিতে হবে, মর্যাদা দিতে হবে । যে জাতি নারীর সম্মান, মর্যাদা এবং অধিকার দেয় না, সে জাতি বা দেশ কখনই উন্নতিলাভ করতে পারে না । তাই তিনি নারী জাতিকে সম্পূর্ণ সম্মান, মর্যাদা ও অধিকার দিয়ে বললেন, মেয়েরা পুরুষের সাথে একসঙ্গে নাম-সংকীর্তন করবে । জমিদারের অত্যাচারের বিরুদ্ধে তৎকালীন সময়ে মহিলা কাছারী বসিয়ে তিনি অত্যাচারী নায়েবের বিচার করেছিলেন । নারীর প্রতি মর্যাদা ও সম্মান প্রদর্শন করাই ছিল এর মূল লক্ষ । ঊনবিংশ শতাব্দীর ইসিহাসে নারীকে এইরূপ বিচারকের আসনে আসীন করানো ছিল বিরল দৃষ্টান্ত এবং গভীর তাৎপর্যপূর্ণ ।
যুগাবতার ঠাকুর হরিচাঁদ সর্বপ্রথম মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার কাজে নামলেন । তিনি ঘোষনা করলেন মানুষে মানুষে কোন ভেদ নেই, সব জাতিই এক । প্রকৃতির আলো-বাতাসে যেমন সবার অধিকার আছে তেমনি সমাজ ব্যবস্থায়ও সবার সমানাধিকার থাকবে । চিরাচরিত সমাজ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন চেয়ে তিনি প্রতিবাদের ধ্বনি ছড়িয়ে দিলেন দিকে দিকে । নিষ্প্রাণ মানুষগুলি ফিরে পেল প্রাণ । চারিদিকে বেজে উঠল ঊলুধ্বনি, জয়ডংকা, কাঁসর ও হরিধ্বনির মহা-কলরোল ।
“হরি বলে ডংকা মার, শংকা কর কা’রে ।
শ্রীহরি সহায় হ’য়ে সাথে সাথে ফেরে ।।”
বিশ্ব ধর্মাবতারের অন্যতম প্রধান শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুর’ই প্রথম মানুষকে ‘মনুষ্যত্ত্ব’ প্রদান করার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন । তিনি মনে করতেন দেশের মানুষই সব । মানুষ সচেতন না হলে এদেশের দূরারোগ্য ব্যাধি কোনদিন মুক্ত হবার নয় । তাই তিনি মানুষকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও রাজনৈতিক চেতনা প্রদানপূর্বক সংসার ও সন্ন্যাসের মধ্যে এক অপূর্ব সমন্বয়ের সৃষ্টি করেছিলেন । তাঁর বাণী নিখিল বিশ্বে ঐক্য ও সংহতির মহামিলনের এক অচিন্ত পূর্ববার্তা । তাঁর প্রচারিত শিক্ষা শুধু ধর্ম শিক্ষাই নয়, তাঁর আদর্শ সমাজ ও জাতীয়তা বোধের শিক্ষা । ঠাকুর বলতেন-----মানুষ সংসার মাঝে সংসারী হয়েই থাকবে কিন্তু যে যে কারণগুলির জন্য মানুষ সন্যাসধর্ম গ্রহণ করে সেই কারণগুলিকেই পাঠাতে হবে সন্ন্যাসে । ঠাকুর হরিচাঁদ সাধন জগতে ভজন ও পূজন প্রণালীতে এবং উপাসনার ক্ষেত্রে সংসারকে এক ধর্ম পরীক্ষার ক্ষেত্র হিসাবে চিহ্নিত করেন যা সন্ন্যাস গ্রহণের চাইতেও দুরন্ত কঠিন । জ্ঞান কিম্বা মোক্ষলাভের আশায় সংসার ছেড়ে সন্ন্যাস গ্রহণ করে বাইরে যাবার কোনও প্রয়োজন নেই । সংসারে থেকেও মতুয়ারা সংসারে আসক্তিবিহীন এক একজন পরম সন্ন্যাসী । মতুয়ারা কোন মন্ত্র-তন্ত্র বা তীর্থ ভ্রমনে বিশ্বাসী নয় ।
“গৃহেতে থাকিয়া যার হয় ভাবোদয় ।
সেই সে পরম সাধু জানিবে নিশ্চয় ।।”
অথবা,
“দেহের ইন্দ্রিয় বশ করেছে যে জন ।
তার দরশনে হয় তীর্থ দরশন ।।”
শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুর ছিলেন ন্যায় ও সত্যের জীবন্ত প্রতীক । অলীক ধর্মীয় কূপমন্ডুকতার নগ্ন প্রাচীরে তাঁর ধর্ম-কর্মের আদর্শ সীমাবদ্ধ নয় । অভিন্ন মানবজাতি গঠনের প্রয়াস লক্ষিত হয়েছে তাঁর মতুয়া উপাধিতে । যেখানে শুধু বাস্তব জ্ঞান, শিক্ষা এবং জ্ঞানমিশ্রিত ভালবাসা । এখানে কোন জাতপাত নেই, সাম্প্রদায়ীকতার বিভেদ নেই; আছে কেবল মানুষের মনে মহাশক্তি জাগ্রত হওয়ার বীজ। গোষ্ঠী নয়, সম্প্রদায় নয়, এ যেন এক আদর্শ সমাজবদ্ধ মানব সত্ত্বা ।
“শুধু নমঃশূদ্র নয় যারা যারা দুখী রয়
সবে মিলে এক সঙ্গে করে ধর্ম যুদ্ধ ।
তেলি মালি কুম্ভকার জোলা তাঁতী মালাকার
ব্রাহ্মণ কায়স্থ বৈদ্য আর নব-শাখ ।।
ব্যাথিত মুসলমান হ’ল কত আগুয়ান
হরিচাঁদে পেয়ে তারা বলে ‘মোরা এক’ ।
গৃহ ধর্ম সু-আচার পিতা দিল ঘরে ঘর ।
দলিত পতিত নর উঠিল মাতিয়া ।।
তাঁর ভাবে ভাব ধরা তাঁর প্রেমে মাতোয়ারা
“মতুয়া” উপাধি কয় সে ভাব দেখিয়া ।।”
যুগাবতার হরিচাঁদ ঠাকুর জানতেন সমাজোন্নতির মূল চাবিকাঠি হল মানুষের গার্হস্থ্য জীবন । একটি শিশুর জন্ম থেকে শুরু করে তাঁর বেড়ে ওঠা, মানসিক বিকাশ, শিক্ষা, কর্মজীবন, জরা, ব্যাধি, মৃত্যু সব’ই ঘটে থাকে সংসারকে কেন্দ্র করেই । তাই পবিত্রতার সঙ্গে গার্হস্থ্য জীবন-যাপন করা মানব জাতির প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য । গৃহের উন্নতি না হলে রাষ্ট্রের উন্নতি সম্ভব নয় । তাই শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুর গৃহাশ্রমকে শ্রেষ্ঠ আশ্রম বলেছেন । অথচ এই সরল সত্যটি পূর্বে কোন মহাপুরুষেরা সোজাভাবে বলে যাননি । তাঁরা ‘ধর্ম’কে জানার জন্য বনে-জঙ্গলে, পাহাড়ে-পর্বতে, বিভিন্ন তীর্থে ভ্রমন করতেন এবং সাধনা তপস্যা ইত্যাদি করেছেন ! তারপর তাঁরা অনেকে অনেক সদুপদেশ ও ধর্মের বাণী শুনিয়ে গেছেন । কিন্তু মানব সমাজ কি শিক্ষা লাভ করেছে ? নিজের স্বাভাবিক কর্ম ভুলে গিয়ে নানারকম অলীক চিন্তাভাবনা ও অলৌকিকতার পিছনে মূল্যবান সময় নষ্ট করেছে । এই ‘স্বাভাবিক কর্ম’ হল সৎ কর্ম, সুখী পরিবার তথা সমাজ গঠনের জন্য কর্ম । শ্রীশ্রীঠাকুর গৃহের পবিত্রতা সর্বদা বজায় রাখতে বলতেন এবং সংযম পালনের মধ্যে দিয়ে গার্হস্থ্য জীবনকে নূতনভাবে গড়ার নির্দেশ দিতেন । তিনি সমস্ত বাঁধা-ধরা শাস্ত্রীয় শৃঙ্খল ও অযৌতিক নিয়মের বেড়াজাল থেকে মুক্ত হবার ডাক দিয়ে প্রচার করেছিলেন, সর্ব ধর্মের সার ‘গার্হস্থ্য ধর্ম’------যার মূল কথাই হল “হাতে কাজ, মুখে নাম।” আরও বলেছেন -------
“জীবে দয়া নামে রুচি মানুষেতে নিষ্ঠা ।
ইহা ছাড়া আর যত সব ক্রিয়া ভ্রষ্টা ।।”
নিপীড়িত জাতি সমূহের একান্ত দুঃসময়ে যদি শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুরের শুভাবির্ভাব না হত, তাহলে জাতপাত, ধর্মান্ধতা, ঘৃণা-বিদ্বেষ, অশিক্ষা-কুশিক্ষা, ব্যাভিচার এবং ভ্রষ্টাচারে দেশ কোথায় গিয়ে পৌঁছাত ভাবা যায় না ! বিশেষত বাংলায় পতিত জাতির অস্তিত্ব-সংকট তৈরী হত । শেষ জীবনে প্রিয় পুত্র গুরুচাঁদ ঠাকুরের উপরে শিক্ষা, সংগঠন ও সমাজ উন্নয়নের কর্মভার অর্পণ করে এই ধর্মযোগী-কর্মযোগী ১৮৭৮ খ্রীষ্টাব্দ বুধবারে নশ্বর দেহ ত্যাগ করে নিত্যলোকে চলে যান ।
শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ ঠাকুর ১৮৪৬ খ্রীষ্টাব্দে ফাল্গুন মাসের দোলপূর্ণিমার দিন শুক্রবার ওড়াকান্দি গ্রামে জন্মগ্রহন করেন । পিতা হরিচাঁদ ঠাকুর যে কর্মভার তাঁর উপর অর্পণ করে গিয়েছিলেন সেই কর্মভার মাথায় নিয়ে তিনি কর্মজীবন শুরু করেন । তিনি উপলব্ধি করেন, পতিত নিপীড়িত মানুষের(যারা ভারতবর্ষের বৃহত্তর গোষ্ঠী) সার্বিক মুক্তি ঘটাতে হলে প্রথমে চাই শিক্ষার বিকাশ । যুগনায়ক গুরুচাঁদ ঠাকুর ঐক্যবদ্ধ মতুয়া শক্তিকে নিয়ে সর্বপ্রথমে শিক্ষা আন্দোলন শুরু করেন এবং সার্বিক শিক্ষার দাবীতে ১৮৭২ খ্রীষ্টাব্দে বাংলায় চন্ডাল বিদ্রোহ সংগঠিত হয় । ঠাকুর গুরুচাঁদ ১৮৮০ খ্রীষ্টাব্দের জানুয়ারী মাসে অখন্ড ভারতবর্ষের পূর্ববঙ্গে(অধুনা বাংলাদেশ) ওড়াকান্দী গ্রামের চৌধুরী বাটীতে অনুন্নত জাতির মধ্যে সর্বপ্রথম পাঠশালা গড়ে তোলেন এবং ১৮৮১ খ্রীষ্টাব্দে প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন । সেই দিন বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে গুরুচাঁদ ঠাকুর ঘোষনা করেছিলেন-------
“যাক জান ধনমান তাতে ক্ষতি নাই,
সব দিয়ে এই দেশে স্কুল রাখা চাই ।।’’
শিক্ষার সার্বিক বিকাশের উদ্দেশে ১৮৮১ খ্রীষ্টাব্দে তিনি পূর্ববঙ্গের(অধুনা বাংলাদেশ) খুলনা জেলার দত্তডাঙা গ্রামে ঈশ্বর গাইনের বাড়িতে প্রায় পাঁচ হাজার লোকের সামনে এক ঐতিহাসিক বক্তব্য রাখেন। সেখানে তিনি বলেন------
“বিদ্যা ধর্ম বিদ্যা কর্ম বিদ্যা সর্বসার।
বিদ্যা-বিনা এ জাতির নাহিক উদ্ধার।।
বিদ্যাহীন জাতি পশুর সমান।
বিদ্যার আলোকে জ্বলে ধর্ম জ্ঞান ।।”
অথবা,
“বিদ্যা যদি পাও কাহারে ডরাও
কার দ্বারে চাও ভিক্ষা।
রাজশক্তি পাবে বেদনা ঘুচিবে
কালে হবে সে পরীক্ষা ।।”
শুধু শিক্ষা বিস্তার করেই থেমে থাকেননি তিনি, পতিত জাতির চাকুরীর জন্যও যথাযত ব্যবস্থা করেছিলেন । তৎকালীন সময়ে সরকারি রিপোর্টে পতিত, অস্পৃশ্য জাতির নামে অসংখ্য গালিগালাজ, চাড়াল, চন্ডাল(বিকৃত ব্যাখ্যা স্বরূপ), দাঙ্গাবাজ ইত্যাদি লেখা ছিল !? ঠাকুর গুরুচাঁদ দেখলেন এ নিয়মের পরিবর্তন না হলে এ জাতি কোনদিন সরকারী চাকুরীতে যোগদান করতে পারবে না । তিনি তাঁর পার্ষদদের নিয়ে এর বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুললেন এবং সেন্সার্সের প্রধান আধিকারিক মিষ্টার গেট সাহেবের নিকট প্রতিবাদপত্র প্রদান করলেন । অবশেষে ডঃ সী, এস, মীডের সহযোগিতায় এই ‘ঘৃণ্য’ গালিগালাজ কেটে সেই স্থলে নাম হল ‘নমঃশূদ্র’ ।
১৯০৭ খ্রীষ্টাব্দে বাংলার গভর্নর লর্ড ল্যান্সলেট বিশেষ কাজে ফরিদপুর এলে তাঁকে স্মারকলিপি প্রদান পূর্বক অনুন্নত ছেলেমেয়েদের জন্য চাকুরির দাবি করেন । লর্ড ল্যান্সলেট সেই দাবি মেনে নিয়ে সর্ব প্রথম গুরুচাঁদ ঠাকুরের পুত্র মহাত্মা শশীভূষণকে সাব রেজিস্টার পদে নিয়োগ করেন । খুলে যায় সারা দেশের নিপীড়িত মানুষের জন্য চাকুরীর দুয়ার । ১৯০৮ খ্রীষ্টাব্দে তিনি হাইস্কুল প্রতিষ্ঠা করেন ও সারা বঙ্গদেশে স্কুল তৈরির নির্দেশ দেন । তারই নির্দেশ ও সহায়তায় বার’শ আঠারোটি বিদ্যালয় স্থাপিত হয় । পরবর্তীকালে তাঁরই আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে মহাপ্রাণ ভক্তরা কয়েক হাজার বিদ্যালয় স্থাপন করেন । গুরুচাঁদ ঠাকুর নারী শিক্ষা ও তাঁদের স্বনির্ভর করে তোলার উপরও বিশেষ জোর দেন । তাঁর নিজ বাড়ীতে “শান্তি-সত্যভামা” নামে বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন এবং পরবর্তীতে হস্ত শিল্পের শিক্ষা দিতে ‘নারী ট্রেনিং’ স্কুল স্থাপিত হয় । (শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুরের সহধর্মীনি শান্তিদেবী এবং শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ ঠাকুরের সহধর্মীনি সত্যভামাদেবী) ।
১৯১১ খ্রীষ্টাব্দে দেশের সমস্ত পিছিয়ে পড়া মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য লর্ড কারমাইকেলের নিকট স্মারকলিপি প্রেরণ করেন ও দীর্ঘদিন ধরে শোষিত, বঞ্চিত, অত্যাচারিত মানুষগুলির জন্য বিশেষ সংরক্ষণের দাবি করেন । ব্রিটিশ সরকার সেই দাবি মেনে নিয়ে সর্বপ্রথম ৩১ টি পিছিয়ে পড়া জাতিকে নিয়ে সংরক্ষণ ব্যবস্থা চালু করেন। তখন পর্যন্ত ভারতের বঙ্গদেশ ব্যতিরেকে অন্য কোন প্রদেশে সংরক্ষণ ব্যবস্থা ছিল না । ১৯১৯ খ্রীষ্টাব্দে মন্টেগু চেমস ফোর্ড অ্যাক্ট-এর মাধ্যমে ভারতের অন্যান্য প্রদেশে সংরক্ষণ প্রথার বিস্তার ঘটে ।
গুরুচাঁদ ঠাকুর স্বাস্থ্যের প্রতিও বিশেষ নজর দিয়েছিলেন । ঘর-বাড়ী, রাস্তা-ঘাট পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে বলতেন সর্বদাই । তিনি জানতেন স্বাস্থ্য না থাকলে সবই অচল তাই প্রতি বাড়িতে শৌচাগার নির্মাণ করতে বলতেন । কোন ভক্ত তাঁকে নিতে এলে প্রথমেই জিজ্ঞাসা করতেন তাঁর বাড়িতে শৌচাগার এবং গ্রামে স্কুল আছে কিনা । যদি শুনতেন শৌচাগার বা স্কুল নেই তবে আগে সেগুলি বানাবার নির্দেশ দিতেন । তারপর তাঁর বাড়ীতে যেতেন । তিনি বলতেন --------
“স্বাস্থ্যহীন জাতি নাহি পায় গতি,
আত্মশক্তি কর রক্ষা।
শিক্ষা স্বাস্থ্য পেলে অজেয় ভূ-তলে,
আর কি বা লাগে ভিক্ষা ।।’’
তৎকালীন সমাজে বাল্য বিবাহ রোধ এবং বিধবা বিবাহের রূপায়নের ক্ষেত্রেও গুরুচাঁদ ঠাকুরের অবদান অসামান্য । মেয়েদের বাল্য বিবাহ অনগ্রসর সমাজের এক মহা অভিশাপ । বাল্য বিবাহের ফলে কত নিস্পাপ বালিকা বিধবা হয়ে যেত । সমাজে তাঁরা অচ্যূত হয়ে পড়ত । সংকটময় পরিস্থিতির মধ্যে তাঁদের জীবন যাপন করতে হত । ঠাকুর গুরুচাঁদ সমস্ত কুসংস্কারের বিরুদ্ধে গিয়ে “নারীমঙ্গল কেন্দ্র” স্থাপনের মাধ্যমে পুনরায় তাঁদের বিবাহ দিয়ে সামাজিক মর্যাদা ও প্রতিষ্ঠা দিলেন ।
তখনকার দিনে অনগ্রসর সমাজের কোন জেলবন্দী মানুষকে অস্পৃশ্য বলে যত নিকৃষ্ট কাজগুলি করানো হত এবং উচ্ছিষ্ট খাবার খেতে দেওয়া হত । জেল ফেরত কয়েদিরা গুরুচাঁদ ঠাকুরকে এই ঘটনা জানালে তিনি ডঃ সী, এস, মীডের সহায়তায় ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে এই কদাচারের কথা সবিস্তারে তুলে ধরেন । বন্ধ হয় এই ধরনের নিকৃষ্ট ঘটনা ।
পতিত, অস্পৃশ্য সমাজের বেশীরভাগ মানুষ-ই ছিল দরিদ্র, নিঃস্ব এবং ভাগচাষী । সারা বৎসর ধরে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তাঁরা সোনার ফসল ফলাত । অথচ নিজেরা প্রায় অন্ন-বস্ত্রহীন হয়ে দিন কাটাত । গুরুচাঁদ ঠাকুর সমস্ত ভাগচাষীদের একত্রিত করে ১৯০০ খ্রীষ্টাব্দের প্রথম দিকে তেভাগা আন্দোলন গড়ে তোলেন । এছাড়াও গ্রামের গরিব চাষীরা তাঁদের উৎপাদিত ফসল উপযুক্ত রাস্তাঘাটের অভাবে দূরে কোন শহরে গিয়ে বিক্রি করতে পারত না । কম মূল্যে মহাজনদের কাছে বিক্রি করতে বাধ্য হ’ত । তাই দয়াল গুরুচাঁদ রাস্তা নির্মানের ব্যাপারেও বিশেষ নজর দিয়েছিলেন ।
তিনি গরিব মানুষদের সাহায্য করবার এক অদ্ভূত উপায় বার করেছিলেন । তাঁদের টাকা ধার দিয়ে বলতেন-----“এই টাকা নিয়ে নিষ্ঠাসহকারে চাষবাস, ব্যবসা কর লাভ পাবি । তখন আসলের সাথে কিছু বাড়তি পয়সা দিস ।” সেই বাড়তি পয়সা তিনি আবার অপরকে দিয়ে একই কথা বলতেন । বাস্তব জীবনে তিনি চাষবাস, ব্যবসা সবই করেছেন । কোন কাজকেই ছোট মনে করতেন না । অর্থ ছাড়া কিছুই সম্ভব নয় । তাই তিনি সৎপথে সামর্থ অনুযায়ী যেকোন কাজের মধ্যে দিয়ে অর্থ উপার্জনের কথা বলতেন । আরও বলতেন-----অর্থকে যারা অনর্থ বলে তাঁরা অর্থের অর্থই বোঝে না । সৎপথে উপার্জিত ধনে মা-লক্ষ্মী বাঁধা থাকে । অলস মানুষদের তিনি কঠোর তিরস্কার করতেন । কিছু না করে কিছু পাওয়ার আশাকে তিনি পাপ বলে মনে করতেন । তাঁর বহুমুখী চিন্তাধারা ও কাজে মুগ্ধ হয়ে ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দে পঞ্চম জর্জ তাঁকে ‘দরবার’ মেডেল দিয়ে সম্মানিত করেন ।
১৯২২ খ্রীষ্টাব্দের জুন মাসে বরিশাল জেলার পিরোজপুরে গুরুচাঁদ ঠাকুরের সভাপতিত্বে বিশাল এক কৃষক সমাবেশে সর্বপ্রথম ভূমি সংস্কারের দাবী তোলা হয় । এরপর কৃষকদের বিভিন্ন দাবী-দাওয়া নিয়ে বাংলার বিভিন্ন জেলায় তিনি সভাসমিতি করেন । কৃষকদের স্বার্থরক্ষার জন্য তিনি ১৯৩৩ খ্রীষ্টাব্দে পশ্চিম মেদিনীপুরের ঘাটালে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় প্রাদেশিক কৃষক সম্মেলনের পঞ্চম অধিবেশনে প্রধান বক্তা হিসেবে যোগদান করেন । তিনি ছিলেন কৃষক দরদী ও পিছিয়ে পড়া দরিদ্র মানুষের মুক্তি আন্দোলনের অন্যতম দিশারী ।
এছাড়াও এই বর্ণময় মহীয়ষী মহাপুরুষ জীবনের শেষদিন পর্যন্ত অজস্র সামাজিক কাজ করে গেছেন । লৌকিক জীবনে তিনি অনেক বাঁধা-বিপত্তি, দুঃখ যন্ত্রনা ভোগ করেছেন; এমনকি জীবিতকালে একে একে তাঁর চার পুত্রের’ই দেহাবসান ঘটে । আদর্শ বীরের মত তিনি সব সহ্য করেছেন, কোন আঘাতেই ভেঙে পড়েননি । কারণ তাঁর দেহ-মন সবই ছিল ধর্মের বর্মে পরিবৃত যা শান্ত শীতল ফল্গু ধারারূপে চির-প্রবাহমান । ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দে এই ধর্মবীর-কর্মবীর চলে যান মহাপ্রস্থানের পথে । পরের বৎসর অর্থাৎ ১৯৩৮ খ্রীষ্টাব্দে কলকাতার এলবার্ট হলে “শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ স্মৃতিসভা” উদযাপিত হয় । যেখানে তৎকালীন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু গুরুচাঁদ ঠাকুরকে ‘মহাপুরুষ’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন এবং গান্ধিজী তাঁর প্রেরিত শ্রদ্ধাঞ্জলি পত্রে গুরুচাঁদ ঠাকুরকে ‘মহানগুরু’ বলে সম্মান জানিয়েছিলেন ।
শ্রীশ্রীহরি-গুরুচাঁদ ঠাকুরের কর্ম-জীবন ও আদর্শ লক্ষ করলে দেখা যায়, একজন ব্যক্তি বা সমাজ কিভাবে শূন্য থেকে পরিপূর্ণতা লাভ করতে পারে তার পূর্ণ বাস্তবায়ন । তাঁরা শুধু জ্ঞানের বাণী বা শান্তির বাণী শুনিয়েই থেমে থাকেননি । মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও উন্নতির জন্য এমন কোন দিক নেই যা হরি-গুরুচাঁদ ঠাকুর ভাবেননি বা করেননি । তাঁরা ধর্ম-কর্ম, ভক্তি ও প্রেমের ভিত্তির উপর “সংসার ও ভগবানের অপূর্ব মিলনের” এক চিরন্তন আদর্শ বা পথ মানব সমাজের কাছে উন্মোচন করে দিয়ে গেছেন ।
যুগাবতার শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুর মনে করতেন আত্মশক্তি জাগরণের মাধ্যমে উন্নতি’ই হল মানুষের প্রকৃত উন্নতি । তাই ‘আচার্য’ মহানন্দ হালদার শ্রীশ্রীঠাকুরের ‘বন্দনা’ অংশে বলেছেন-------
“চিত্তের গুহায় মম জীবাত্মা ঘুমায় রয়,
তাহারে জাগাতে তত্ত্ব শিখালেন দয়াময় ।।”
শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে এবং আত্মবলে বলীয়ান হয়ে তাঁর’ই মহান ভক্তরা গর্জে উঠেছেন সমস্ত অন্যায়ের বিরুদ্ধে বীরবিক্রমে । মানুষ ফিরে পেয়েছে সব অধিকার; ফিরে পেয়েছে মুখের ভাষা । ঠাকুর চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছেন ব্রাহ্মণ্যবাদী সমাজের নগ্নতা-------এরা ‘মৎস’, ‘কুর্ম’, ‘বরাহ’, ‘সিংহ’ ইত্যাদি ইতর প্রাণীদের ঈশ্বর বলে স্বীকার করলেও মানুষকে ‘মানুষ’ বলে স্বীকার করে না ! গান্ধিজি যখন ‘দেশবন্ধু’ চিত্ত রঞ্জন দাশ মারফত পত্রযোগে গুরুচাঁদ ঠাকুর’কে বার্তা দিয়েছিলেন তাঁর ‘অসহযোগ আন্দোলন’কে সমর্থন করবার জন্য, ঠাকুর গুরুচাঁদ তাঁর যে প্রত্যুত্তর দিয়েছিলেন তা আমাদের কাছে বিশেষ শিক্ষনীয় । গুরুচাঁদ ঠাকুর বলেছিলেন----মহাশয়, দেশ বল কারে ? দেশ মানে কি শুধু আকাশ, মাটি, জল ? নাকি দেশের মানুষকেও বোঝায় ? যে দেশে মানুষ নেই তাকে কি কেউ দেশ বলে জানে ? যে দেশের সিংহ ভাগ মানুষকে তোমরা করে রখেছে অস্পৃষ্য, শিক্ষাহীন, সহায়-সম্বলহীণ, তারা তো দেশই চিনল না, তাহলে দেশের জন্য কি আন্দোলন করবে ? স্বাধীনতার পরই বা এরা কি পাবে ? যদি সত্যিকারের স্বাধীনতা চাও তবে আগে এদের মানুষের অধিকার দাও, শিক্ষার ব্যবস্থা কর, ভাই বলে কাছে টেনে নাও । আগে এদের চেতনা আসুক, দেশ চিনুক-----তবেই এরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আন্দোলনে সামিল হবার যোগ্যতা অর্জন করবে, প্রকৃত স্বাধীনতার পথ সুগম হবে ইত্যাদি ইত্যাদি । অতঃপর দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ঠাকুর গুরুচাঁদের প্রত্যুত্তরের সকল কথা গান্ধিজিকে জানালে তিনি মন্তব্য করেছিলেন-----“প্রকৃত তত্ত্বের বাণী আজ শুনলাম, এটাই সত্য । এ-পথ ছাড়া আমাদের সব আন্দোলন হবে বৃথা” । তখন তিনি ওড়াকান্দী যাবার ইচ্ছা প্রকাশ করেন; যদিও গান্ধিজির সে ইচ্ছা পূরণ হয়নি । বলা বাহুল্য, এর পর গান্ধিজি অস্পৃষ্য আন্দোলন করেছিলেন ।
সুস্থ শরীর, সুস্থ মন ও সুকর্ম ছাড়া যেমন কেউ বড় হতে পারে না আবার সু-আদর্শ ছাড়া সমাজ জীবনের রূপরেখা তৈরী করা যায় না । কু-কর্মে হয়তো সাময়িকভাবে আনন্দ মেলে (বিকৃত), কিন্তু আত্মার শান্তি হয় না । শুরু হয় বিবেকের সাথে মনের সংঘর্ষ । এর ফল হয় মারাত্মক । তৈরী হয় বিষ (আত্মত্পীড়ন) । আর এই বিষ ধীরে ধীরে শেষ করে দেয় আমাদের সুন্দর মন ও শরীর। শুরু হয় বিপথে চলা । আমরা হয়ে পড়ি দিক্-ভ্রান্ত । তারই দৃষ্টান্ত আমরা দিকে দিকে দেখছি ।
“দেহ মন নহে শুচি গৃহধর্ম করে ।
ছিদ্রযুক্ত তরী সম ডুবে যে সাগরে ।।”
শ্রীশ্রীহরি-গুরুচাঁদ ঠাকুরের দেখানো পথে আত্মবলে বলীয়ান হয়ে পবিত্র গার্হস্থ্য ধর্ম পালনের মাধ্যমে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে সেই ‘অধরা’ কে ‘ধরা’র দিকে ।
“সংযম সাধনা করি হয়ে মহা শক্তিধারী
গড়িবে সংসার ।
সুকর্মে সংসার ধর্ম পালিতে কর্তব্য কর্ম
বিধানে তাহার ।।”
ঠাকুর গুরুচাঁদ চাইতেন, প্রতিটি মানুষ শিক্ষা পেয়ে হয়ে উঠুক সংস্কৃতিবান ও বিশেষজ্ঞ । আত্মোন্নতির সাথে সমাজের, দেশের ও জাতির উন্নতিসাধনই হোক শিক্ষার মূল কথা । কারণ মানুষের চরিত্র গঠন না হলে ব্যক্তির ‘মানুষ’ হয়ে ওঠা সম্পূর্ণ হয় না । ব্যক্তি মানুষ না হলে পরিবার ও সমাজের কল্যাণ সম্ভব নয় । সকলের উর্ধে মানবিকতা ও মনুষ্যত্ত্ববোধ । তা না হলে সব বৃথা । তাই গুরুচাঁদ ঠাকুর সকলকে মতুয়াধর্মের “দ্বাদশ আজ্ঞা” মেনে চলতে বলতেন ।
মতুয়া ধর্মাদর্শে দ্বাদশ আজ্ঞাঃ
১। সদা সত্য কথা বলিবে ।
২। পরস্ত্রীকে মাতৃ জ্ঞান করিবে ।
৩। মাতা-পিতাকে ভক্তি কর ।
৪। জগতকে প্রেম কর ।
৫। জাতিভেদ করিবে না ।
৬। ষড়রিপুর নিকট সাবধান থাকিবে ।
৭। কাহারো ধর্ম নিন্দা করিও না ।
৮। বাহ্য অঙ্গ সাধু সাজ ত্যাগ কর ।
৯। হাতে কাজ মুখে নাম কর ।
১০। ‘শ্রীহরি’ মন্দির প্রতিষ্ঠা কর ।
১১। ঈশ্বরে আত্মদান কর ।
১২। দৈনিক প্রার্থনা কর
এই আজ্ঞা জীবনমুখী ও বাস্তবসম্মত; এখানে শৃঙ্খলা আছে কিন্তু কোন শৃঙ্খল নেই । আত্মোন্নতি ও সুখি পরিবার গঠন করতে “দ্বাদশ আজ্ঞা”র মধ্যে দিয়ে গার্হস্থ জীবন অতিবাহিত করা অবশ্য কর্তব্য । পরিবার সুন্দর হলে সমাজ আপনা হতেই মজবুত হবে, দেশ সুগঠিত হবে । জাতির উন্নতির জন্য শিক্ষা এবং অর্থের কোন বিকল্প হয় না । আবার ‘মনুষ্যত্ত্ববোধ’ না থাকলে সব’ই অর্থহীন হয়ে পড়ে । গুরুচাঁদ ঠাকুর কথা প্রসঙ্গে একবার ভক্তদের বলেছিলেন ---“যে শুধু ‘ঐশ্বর্যবান’ সে আমার পিতার ভক্ত হতে পারে না; আবার যে শুধু ‘ভক্তিবান’ সেও তাঁর ভক্ত নয় । যার মধ্যে ভক্তি ও ঐশ্বর্য দু-ই আছে, সেই হল প্রকৃত ভক্ত ।”
শ্রীশ্রীহরি-গুরুচাঁদ ঠাকুর দ্বারা সমগ্র ভারতবর্ষ ও বাংলাদেশের মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে উপকৃত একথা অস্বীকার করার কোন জায়গা নেই । তথাকথিত কেতাবী শিক্ষায় শিক্ষিত না হয়েও তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থার উপর দাঁড়িয়ে শ্রীশ্রীহরি-গুরুচাঁদ ঠাকুর যে কাজ করে গেছেন এবং যে ধর্মপথের সন্ধান দিয়ে গেছেন তা শুধু ভারতবর্ষ নয়, পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল । তাঁরা দিন-রাত জেগে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে পিছিয়ে পড়া চির-নিদ্রিত মানব জাতির মুক্তির পথ সুগম করে গিয়েছেন যা আজ বাংলা তথা সমগ্র ভারতবর্ষের তপশীলভূক্ত সম্প্রদায়সমূহের অগ্রগতির মূল পাথেয় । আচার্য মহানন্দ হালদার রচিত “শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ চরিত” গ্রন্থে আছে------
“তপশীল জাতি মধ্যে যা কিছু হয়েছে ।
হরিচাঁদ কল্পবৃক্ষে সকলি ফলেছে ।।
হরি-কল্প বৃক্ষে ফলে সঞ্জীবনী ফল ।
সে ফল বিলায় গুরু পরম দয়াল ।।
সে গুরু পরম গুরু গুরুচাঁদ নাম ।
শত কাশীতুল্য যার ওড়াকান্দী ধাম ।।
কেন হেন হ’ল কেন জাগিয়াছে জাতি ?
কে করেছে প্রাণ দান জেগে দিবা রাতি ।।
আজ কেহ নাহি করে তাহার সন্ধান ।
শুধু শুধু হ’ল নাকি সবে মান্যবান ।।”
তাঁদের বাস্তবসম্মত, জীবনমুখী এবং প্রতিবাদী বিপ্লবী সত্ত্বার মাধ্যমে ঘটেছে সমাজের নবজাগরণ । সমস্ত অধিকার বঞ্চিত মানুষেরা খুঁজে পেয়েছেন আপনা ধর্ম, আপনা কর্ম । তাই একথা বলা যায়, শ্রীশ্রীহরি-গুরুচাঁদ ঠাকুর প্রকৃত অর্থেই ‘পতিত পাবন’ । ‘মতুয়া’ শব্দটি শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুরের দেওয়া একটি উপাধি । যারা যুক্তিবাদ ও মানবতাবাদের ভাবধারা নিয়ে বাস্তবসম্মত পথে চলেন, তারাই মতুয়া । মতুয়ার যুক্তি আছে, ভক্তিও আছে । এই ভক্তি অন্ধ বিশ্বাস নয়, এ হল জ্ঞানমিশ্রিত ভালবাসা । জ্ঞানমিশ্রিত ভালবাসা না থাকলে বোধহয় ব্যক্তি’র মানুষ হয়ে ওঠা সম্পূর্ণ হয় না এবং ‘নামে’ রুচি আসে না । শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুর কোন অলৌকিক দেব-দেবীর পূজা করতে বলেননি এবং কোন নূতন ধর্মেরও সৃষ্টি করেননি । তিনি মানুষকে নিজ-ধর্মে প্রতিস্থাপিত করেছেন । মানুষকে ভাল আর মন্দের তফাৎ বোঝার মতো পথ দেখিয়ে গেছেন । তিনি রক্ত-মাংসের দেহ নিয়ে পতিতের ঘরে পতিতের বেশে পতিতের তারণ-হার হয়ে এসেছিলেন । তাই সমস্ত পিছিয়ে পড়া পতিত জাতির কাছে তিনি ভগবান । মতুয়ামত ও মানবতাবাদের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই । আমরা ভাল ভাবব, ভাল হব, ভাল করব ও ভাল থাকব অর্থাৎ সার্বিক উন্নতির মাধ্যমে সামাজিক সাম্যতা প্রতিষ্ঠাই মতুয়াবাদের একমাত্র লক্ষ ।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন